প্রথম খন্ড লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রথম খন্ড লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

দূতী ও দূত কর্ম

কামসাধানায় নারী-পুরুষের বিভিন্ন ধারা

শাস্ত্রমতে কামচর্চার জন্য কোনও নারী লাভ করতে গেলে, স্ববর্ণীয় বা স্বজাতির কোন অবিবাহিতা কিশোরীকে শাস্ত্র ও সমাজ সম্মতভাবে বিবাহ করে তার সঙ্গে সহবাস করা উচিত কিন্তু কোনও উচ্চবংশীয় নারী বা নীচ বংশীয়া মেয়েমানুষ অথবা অন্য কোনও লোকের বিবাহিতা পত্নীর সঙ্গে সহবাস নিষিদ্ধ।

উপরের শাস্ত্রসম্মতভাবে বিবাহিত নারীর সঙ্গে সহবাস করলে যে সন্তান বা সন্ততি জন্মায় তারাই হল কুল প্রদীপ। এছাড়া কোনও বারাঙ্গনা বা বিধবার সঙ্গে সহবাসে যে সন্তান হয় তারা পূর্বপুরুষের বংশধারার স্থান পায় না। তাদের সঙ্গে সহবাসে পুরুষ বেশি সুখ উপভোগ করতে পারে কিন্তু সন্তান বংশের ধারায় স্বীকৃত হয় না।

সহবাসের অনুমোদিত নারী

তিন প্রকার সাধারণতঃ বাৎস্যায়নের মতে দৈহিক সহবাসের জন্য অনুমোদিত-

১। সমাজসম্মতভাবে বিবাহিতা স্ত্রী।

২। বারাঙ্গনা বা পতিতা নারী
।

৩। বিধবা নারী।

আচার্য গণিকাপুত্র যোনিসুখের জন্য আর একশ্রেণীর নারীর কথা লিখেছেন।

ক) অন্যের স্ত্রী উপভোগ করা যায়; সম্পত্তি বা ধনলাভের সম্ভাবনা থাকলে।

খ) আ
ত্মরক্ষার্থে বা জীবন বাঁচাবার জন্য।

গ) বন্ধুত্ব দৃঢ় করার জন্য
।

অন্যের বিবাহিতা স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসুখ লাভ করা সাধারণতঃ পাপকার্য কিন্তু যদি জানা যায় ঐ নারী স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের সঙ্গে এর আগে যৌন সহবাস করেছে বা করে তাহলে সে স্ত্রীলোক উচ্চবংশীয় হলেও সহবাসের পক্ষে উপযুক্ত বলে বিবেচিত। এতে ধর্মনাশের কোন প্রশ্ন ওঠে না।

নরনারী উপভোগের বিধিসম্মত ব্যবস্থা

গণিকাপুত্রের মতে নিম্নলিখিত অবস্থায় নরনারী উপভোগ বিধিসম্মত।

১) যদি কোনও লোক প্রতাপসম্পন্ন ও ধনবান হয় কিন্তু যদি কোন
ব্যাক্তির শত্রুর সঙ্গে যোগদান করে থাকে, তা হলে পূর্বোক্ত ধন ও প্রতাপসম্পন্ন ব্যাক্তির স্ত্রীর সঙ্গে সুবিধা হলে সহবাস করা সঙ্গত। কেননা, তার নারীর সঙ্গে সহবাসে সে ব্যাক্তি শত্রুর দল ছেড়ে উপপতির দলে আসতে পারে বা স্ত্রী তাকে আসতে প্রলুব্ধ করতে পারে।

২) ঠিক সেই নারীর সঙ্গে অবৈ
ধ্য প্রণয় করা যেতে পারে যার স্বামী বহু কালের পরম শত্রু বা শত্রুতা করে আসছে। এরূপ ধর্ষিতা স্ত্রী স্বামীকে বন্ধুত্ব পদে আনতে পারে।

৩)
যে নারী তার স্বামীকে ভবিষ্যৎ উপপতির বন্ধর দলে আনতে পারে এবং উপপতির শত্রু নাশ করেত প্রলুব্ধ করতে পারে।

৪) কোনও নারীর স্বামী যদি কা
রও ঘরবাড়ী, সম্পত্তি বা ধনদৌলত কেড়ে নিতে থাকে, তা হলে সঙ্গে শেষোক্ত লোক প্রণয়স্থাপন বা যৌন সহবাস করতে পারে। ফলে হয়ত ঐ ব্যাক্তির স্ত্রীর সাহায্যে সে ঘরবাড়ী বা ধনদৌলত ফিরে পেতে পারে।

৫) যে নারীর সাহায্যে কোনও পুরুষ বিপদ ছাড়া কোনও অর্থ উপার্জন করতে পারে ঐ নারীর সঙ্গে যৌন সংসর্গ সে নিঃসন্দেহে করতে পারে।

৬) যে নারী অত্যন্ত কামুক এবং তার কাম পরিতৃপ্তি না হলে উপপতির বিশেষ নিন্দা প্রচার করতে পারে। এরূপ নারীর সঙ্গে ব্যভিচার করতে পারে।

৭) যে নারী তার ঈপ্সিত পর পুরুষের বিশেষ ক্ষতি এমন কি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে সে নারীকে উপভোগ করে জীবন ধন বাঁচানো যেতে পারে।

৮) যে নারী স্বামীকে শত্রুর সঙ্গে যোগদান করিয়েছে, এমন কি নিজেকে শত্রুর দলে মিশিয়েছে, সুযোগ ঘটলে সে নারীর সঙ্গে কাম সম্পর্ক স্থাপন করা যায়।

৯) যদি কোনও পুরুষ অন্য পুরষের পত্নীর সঙ্গে কাম সম্পর্ক স্থান করে
থাকে, তাহলে শেষোক্ত পুরুষ প্রতিশোধ নেবার জন্যে প্রথমোক্ত পুরুষের স্ত্রীর সঙ্গে ইচ্ছামত ব্যভিচার করতে পারে।

১০) রাজ-অন্তঃপুর লু
কায়িত শত্রুর অনুসন্ধান করতে পারে বলে কোন লোক রাজার অনুগৃহীতা পরস্ত্রীর সঙ্গে কাম সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে।

১১) কোন অভীপ্সতা কুমারীকে বিবাহ করতে হলে যে নারী এ বিবাহ সফল করে দিতে পারে, তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক চলতে পারে।

১২) যে নারীর স্বামী কারও পত্নী বা উপপত্নীকে প্রলুব্ধ করে কেড়ে নেয়, তা হলে শে
ষোক্ত ব্যাক্তিও ঐ নারীকে শয্যাশায়িনী করতে পারে।

১৩) শত্রুতা থাকলে যে কোনও লোক শত্রুর স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচার করতে পারে।

১৪) চারায়ণ, কামশাস্ত্রের একজন লেখক, আরও বেশী সাহ
সী, তিনি বলেন, রাজার ভার্য্যা অথবা অন্যান্য রাজকর্মচারীদের নারী বা বিধবাগণ অর্থ উপার্জন সহায়তায় পথের দিক দর্শন করে। তাই তারাও উপভোগ্যা।

১৫) সুর্বণাভ বলেন, বিধবা সন্ন্যাসীনীরাও উপভো
গ্য।

পুরুষের শ্রেণীবিভাগ

যে কুমারী নারী কখনও কোনও পুরুষের সঙ্গে কামক্রিয়া করে নি, সে কুমারীর নাম অনাঘ্রাত কুমারী। কিন্তু যতই কোনও নারী বা নারীদের সঙ্গে যৌনক্রিয়া করে থাকুক সে চিরদিন যৌনশক্তি সম্পন্ন ও নারীদের কাম্য।

নিষিদ্ধা নারী

বাৎস্যায়নের মতে নিম্নলিখিত নারীরা চিরদিন পুরুষের সঙ্গে সঙ্গমে নিষিদ্ধ।

১
। কুষ্ঠ রোগ সংক্রান্ত নারী।

২। যক্ষ্মা রোগগ্রস্তা নারী।

৩। উন্মাদ রোগ আক্রান্তা নারী।

৪। জাতি বা সমাজ পরিত্যাগী নারী।

৫। যে নারী প্রেমের গোপন সংবাদ রক্ষণে অসমর্থা।

৬। যে নারী এত কামুকী যে সাধারণের দৃষ্টির সামনেও যৌন সহবাস করতে প্র
স্তুত।

৭। বয়
স্কা নারী।

৮। যে নারীর চোখ পাটকিলে রং কিন্তু অতি শুভ্র চর্ম।

৯। যে নারী অত্যন্ত কালো।

১০। যার মুখে বা যোনিতে অত্যান্ত দুর্গন্থ বের হয়।

১১। নিকটাত্নীয়, যেমন বোন পিসতুতো বোন প্রভৃতি
।

১২। নিজের স্ত্রীর কোনও বান্ধবী।

১৩। সন্ন্যাসিনী বা ব্রহ্মচারিণী নারী।

১৪। কোনও আত্নীয়ের স্ত্রী।

১৫। কোনও বন্ধুর স্ত্রী।

১৬। কোন পণ্ডিত বা গুরুপত্নী।

১৭। রাজপত্নী।

বাভ্রব্য বলেন, যে নারী তার পতি ছাড়া আরও পাঁচজন পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক রয়েছে তার সঙ্গে অবাধে মিলন চলতে পারে।

দূতী নির্বাচন

প্রেম সম্পর্ক স্থাপন করতে দূতীর প্রয়োজন হয়ে থাকে। এই দূতীর মাধ্যমে অন্য নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। এই দৌত্য করার জন্য নিম্নলিখিত ধরণের নারী খুব প্রশস্ত।

১। বাল্যের বান্ধবী।

২। যে লোকের কোন উপকার করা হয়েছে এমন লোক বা তার স্ত্রী।

৩। সম
ব্যবসায়ী কোন লোক বা তার স্ত্রী।

৪। সগোত্র বা সহপাঠী বা পাঠিনী।

৫। মনের সব গোপন কথা জানে এমন বন্ধু বা তার স্ত্রী।

৭। যাকে সব কথা বলা চলে এমন বন্ধু বা তার স্ত্রী।

৮। যদি সমবয়সী ধাত্রীপু
ত্র বা ধাত্রী কন্যা থাকে।

৯। সমবয়সী লোক একসঙ্গে বাস করে বা তার স্ত্রী।

দৌত্য কার্য্যে গুণ

প্রথম দূত বা দূতীর কতকগুলি গুণ থাকা একান্ত প্রয়োজন। তা হচ্ছে-

১। এরা উচ্চবংশীয় হওয়া উচিত।

২। এরা প্রতারণা পরায়ণ হবে না।

৩। এদের মন
স্থির হবে।

৪। এরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবে।

৫। এরা লোভী বা দূর্নীতি পরায়ণ হবে না।

৬। এরা স্বদেশে থাকবে।

৭। অপরিচিত লোককে গুপ্ত উদ্দেশ্য প্রকাশ করবে না কখনও।

নিম্নজাতির দূতী

চারায়ণ বলেন, নীচজাতীয় লোকের সঙ্গেও বন্ধুত্ব স্থাপন করা যায়, দূত নির্বাচনও করা যায়। তা হল-

১। রজক বা ধোপা।

২। নাপিত।

৩। বাগানের মালী
।

৪
। গন্ধ বা আতর ব্যবসায়ী।

৫। মদ্য বিক্রেতা।

৬। স্বর্ণকার।

৭। পীঠ মর্দ - বিলাস শিক্ষক
।

৮। বিট -bযে নায়িকা বেশ্যার বিশ্বস্ত
।

৯। বিদূষক - ভাঁড় জাতীয় লোক
।

এই নয় ধরণের লোকেরা প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে যেতে পারে, তাই সফল হয়। অবশ্য বুদ্ধিমান লোক হওয়া উচিত, এদের পত্নীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা। এর কারণ হল নারীই পুরুষদের দোষগুণ সম্পর্কে সংবাদ সহজে সংগ্রহ করে দিতে পারে।

বিশেষ দূতীর গূণ

যে লোক অতি সহজে বারাঙ্গনাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে আবার বিলাসী লোকদেরও বন্ধু হয়, সেই লোকই সহজে প্রণয়িনী জোগাড় করতে পারে কিন্তু এ কাজটি খুব সহজ নয়। এর জন্যে যে গুণগুলি অবশ্যই থাকা দরকার তা এখানে বলা হচ্ছে-

১। যে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা করতে
পারবে।

২। সে বিশেষ ভাবে সাহসী ও সব কাজে অগ্রসর হবার মত মনের বল রাখবে
।

৩। সে লোকদের এমন গুণ থাকবে, যে কোনও লোকের মুখ দেখেই তার মনের ভাব বুঝতে পারবে।

৪। সহজে তার মন দমবে না।

৫। অপরের মনের গোপন কথা না বললেও বুঝতে পারবে।

৬। স্থান ও কাল বুঝে উচিত মত পরিবর্তনের পারদর্শিতা থাকবে।

দৌত্যের প্রয়োজনীয়তা

দৌত্যের প্রয়োজন কেন হয় তা বলা হচ্ছে। যখন কোন নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে না পারা যায়, তখন বাধ্য হয়ে এই দৌতের কার্যের সহায়তা নেওয়া উচিত কিন্তু সব গুন না থাকলে দৌত্য কাজে কখন সফল হবে না, বরং তাতে সুফলের বদলে কুফলই ফলতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

দায়িত্ব ও কর্তব্য

পুরুষের কর্তব্য

যেমন নারী, তেমনি পুরুষের পক্ষেও কলাবিদ্যা বা ভালোবাসার বিজ্ঞান এমনভাবে শিক্ষা করা উচিত যাতে তার ভার্য্যা বা উপপত্নী সন্তোষের সঙ্গে জীবন যাপন করতে পারে। বাল্যে ও কৈশোরের গুরুগৃহে বা পাঠশালায় বিদ্যা অর্জন করার পর প্রত্যেক নাগরিকের অর্থোপার্জন করায় নিযুক্ত হওয়া অবশ্য উচিত।

শাস্ত্রে আছে, ব্রাহ্মণ লোকের কাছ থেকে দান গ্রহণ করবে, ক্ষত্রিয় যুদ্ধে জয়লাভ করে কৃতিত্ব দেখাবে, বৈশ্য যুবক ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থ উপার্জন করবে আর শূদ্র যুবক পরের সেবা করে জীবন যাপন করবে। অর্থ উপার্জনের পর নাগরিক তার নিজের জন্য বসত বাড়ি তৈরী করবে। সে সর্ব প্রকার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করবে। মানুষের উচিত রাজধানীতে বা অন্য বড় শহরে বাসগৃহ নির্মাণ করা, তবে বহু গণ্যমান্য লোকের সঙ্গে তার সহৃদয়তা বা বন্ধুত্ব হয়ে থাকে।

গৃহ নির্মাণ কলা

বাড়ি এমন স্থানে নির্মিত হওয়া উচিত যাতে জল পাবার কোন কষ্ট না হয়। বাৎস্যায়নের শাস্ত্র পড়ে মনে হয়, যে সময়ের কথা লেখা হয়েছে সে সময় শহরে, নগরে জল পাবার ব্যবস্থা ভাল ছিল না। এই বাড়ি ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য সাধন করতে ভিন্ন ভিন্ন অংশে গঠিত হওয়া উচিত। বাড়িতে ফুলবাগান, উদ্যান, লতাকুঞ্জ ইত্যাদি থাকবে। এ অংশের কক্ষগুলি দু’ভাবে বিভক্ত হবে - বহির্বাটী ও অন্তঃপুর। অন্তঃপুর হবে নারীদের আবাস্ত, বর্হিবটীতে থাকবে বৈঠকখানা যেখানে বিভিন্ন সুরসিক জ্ঞানী বা বাণিজ্য সম্পর্কিত লোকেরা বসে কথাবার্তা বলবে। এই বৈঠকখানায় বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে খেলাধুলাও হতে পারে। বৈঠকখানার মেঝে মাদুরের দ্বারা ও জানালা পট্ট বস্ত্রের দ্বারা আবৃত থাকবে। এখানে একটি সুন্দর বিছানা থাকবে, এক ধারে ফুলদানীতে ফুল থাকবে। বালিশ বেশ নরম হবে। প্রধান পর্যাঙ্কের কাছে থাকবে একটি শয্যা সেখানে গৃহকর্তা তাঁর প্রিয় নারীদের সঙ্গে রতি কার্য করলেও শয্যা বসন সিক্ত বা কলুষিত হবে না। এর মাথার দিকে থাকবে ব্রাকেট গৃহ, দেবতার একটি প্রতিচ্ছবি বা ছবি। এই ছবির নীচে থাকবে একটি টেবিল। এই টেবিলে থাকবে যে দ্রব্য তা হল সুগন্ধি দ্রব্য, পুষ্পমাল্য, মোমবাতি, সুগন্ধি পান, দাড়িম্বের খোসা ও তাম্বুল। বিছানার তলায় থাকবে পিকদানী। এছাড়া, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য থাকতে পারে বীণা, ছবি আঁকার পাত্র, ব্রাশ, রঙ, বই, হাতীর দাঁতের তৈরী বস্তু, পুষ্পনির্মিত স্তবক প্রভৃতি। ঘরের বিছানা ছাড়া, বালিশ থাকবে। সব ঘরে মাদুর বিছানো থাকা উচিত। দাবা পাশা থাকবে ঘরে।

বাইরের গৃহসজ্জা

এই বৈঠকখানা ঘরের বাইরে থাকবে বারান্দায় ময়না, টিয়া প্রভৃতি পাখি। গ্রীষ্মকালের জন্য থাকবে বাসগৃহের পাশে একটি বাগান। বাগানটি হবে মনোরম। এই বাগানে একটি ছায়াযুক্ত গাছের তলে থাকবে একটি দোলনা। এই দোলনাটি হবে সুদৃশ্য। এই বাগানে ফোয়ারা থাকলে ভাল হয়, না থাকলে কয়েকটি সুদৃশ্য বেদী থাকবে। বেদীতে থাকবে সুগন্ধি ফুলচন্দন। এর চারিদিকে লতাপাতা ও সুগন্ধি ফুলের বৃক্ষ থাকবে।

নাগরিকদের দৈনিক জীবনধারা

১। সকালে উঠে নাগরিক প্রাতঃকৃত্যাদি করবে। তার মধ্যে দাঁতমাজা, মুখ ধুয়ে ফেলা ইত্যাদি থাকবে।

২। স্নান করবে সুগন্ধি জল দিয়ে। তোয়ালে দিয়ে গা মুছবে।

৩। চন্দনাদি সুগন্ধি দ্রব্য অঙ্গে লেপন করবে। ঠোঁটে একটু লিপষ্টিক লাগাবে। গলায় একটি মালা ঝোলাবে।

৪। একটি আয়নায় ভাল করে মুখ দেখে কেশ রচনা করবে।

৫। অবশেষে নিজের কাজে বের হবে।

সম্ভ্রান্ত নাগরিকের উচিত

১। প্রত্যহ একবার স্নান করবে।

২। একদিন অন্তর ভাল করে গাত্রমর্দন বা গাত্র মার্জনা করা।

৩। প্রতি তৃতীয় দিনে মালা দরকার।

৪। প্রত্যেক চতুর্থ দিনে মুখের দাঁড়ি গোঁফ কামানো আরামদায়ক হয়ে থাকে।

৫। প্রত্যেক পঞ্চম দিনে মাথার চুল কাঁটা উচিত।

৬। প্রতি দশদিন অন্তর দেহের গোপনীয় স্থানের কেশ মুণ্ডন করা উচিত।

৭। রোদের সময় বিনা ছাতায় বের হবে না। তা হলে শরীর থেকে বেশী ঘাম বের হতে পারে, বেশী ঘাম দুর্গন্ধ যুক্ত হয়।

৮
। দিবারাত্রে দুবারের বেশি ভোজন। দুপুর ও সন্ধ্যা, প্রত্যহ দুবার প্রধান আহারের পর উচিত প্রিয় পাখিদের কথা বলা শেখানো। ভেড়া ইত্যাদি থাকলে তাদের কৌতুক যুদ্ধ শেখানো।

৯। সকালে মুখ, হাত, পা, ধুয়ে কিছু সামান্য খেয়ে বন্ধুবান্ধব প্রভৃতিদের সঙ্গে কথাবার্তা বলবে। দুপুরে খাবার পর দিবানিদ্রা বা ঘুম হবে।

১০। দিবা নিদ্রার পর সংগীত চর্চা বা ক্রীড়া প্রভৃতি চলতে পারে।

১১। তারপর বাইরে কাজ থাকলে বের হয়ে সন্ধ্যায় ফিরবে।

১২। বাড়ি ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা, গল্প প্রভৃতি করতে থাকবে
। তারপর বন্ধুদের বিদায় দেবে।

১৩। তারপর প্রণয়িনীদের সঙ্গে দেখা করবে বা তার আগমন প্রতীক্ষা করবে। সে এলে কুসুমাস্তীর্ণ শয্যায় তাকে বসাবে। মধুর নরম বাক্য বলে তাকে আনন্দ দেবে। তার আসতে বিলম্ব হলে তার জন্যে দূত পাঠাবে।

১৪। দূতীর বাক্যেও যদি প্রণয়িনী না আসে তা হলে নিজে তার বাড়ি যাবে, নানা সন্তোষ করে তাকে নিয়ে আসবে। যদি বৃষ্টি থাকে ও তার গা বা বস্ত্র ভিজে যায়, তাকে শুকনো বস্ত্র পড়িয়ে দেবে। যেন বন্ধু বান্ধবেরা সে সব কাজে সাহায্য না করে। নিজের বস্ত্রাদি ভিজে গেলেও পরিবর্তন করবে।

১৫। তারপর সবাইকে বিদায় দিয়ে প্রণয়িনীর সঙ্গে সুমধুর সম্ভাষণ করবে।

১৬। প্রণয়িনীকেই সমস্ত রাত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান দান করা অবশ্য কর্তব্য। যদি এ বিষয়ে কোনও ভুল হয়, তার জন্যে প্রণয়িনীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে কোন দোষ নেই।

উপরে সে সব জীবন বৃত্ত লিখিত হল, তা শুধুমাত্র ধনী ও যার অবসর প্রচুর তাদের পক্ষেই সম্ভব। রাতে প্রণয়িনী নিয়ে সম্ভোগ ঠিক ভাবেই হতে পারে।

নৈমিত্তিক নাগরিককৃত বা সামাজিক কর্ম

উপরের প্রাত্যহিক কর্ম ছাড়া অনেক সামাজিক কাজ ও অনুষ্ঠান নাগরিকের পালন করা উচিত। এতে নাগরিক সমাজের মধ্যে একটি সম্মানও প্রতিষ্ঠা হয়। বাৎস্যায়ন নিম্নলিখিত সামাজিক অনুষ্ঠানগুলির অবশ্য পালনীয় বলেছেন।

১। ঘটা নিবন্ধক

দেবতার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত সব উৎসবে নাগরিকের অবশ্যই যোগদান করা উচিত। এতে দেশ বা বিদেশ থেকে আগত শিল্পীরা সংগীত ও অন্য নানা কলা উৎসবের নৈপুণ্য দেখাতে পারে। এতে মানব সংস্কৃতি উন্নতি লাভ করে। মাসে অন্ততঃ একবার তা অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত।

২। গোষ্ঠী সমন্বয়

সমান বয়স্ক বা সমান চরিত্র বা সম চরিত্রবান যুবকদের মিলন ও সমন্বয়। এতে ভাবের আদান-প্রদানে প্রচুর সাহায্য হয়ে থাকে। এরূপ জন সমাবেশ কোন সম্ভ্রান্ত রাজকর্মচারীর বৈঠকখানায় বা অলিন্দে, কোন নৃত্যকালয়ে বা বন্ধু-বান্ধবদের বহিঃকক্ষে হওয়া উচিত। এই সম্মিলনীতে নৃত্যগীত বা কোন প্রবন্ধ পাঠ হতে পারে। নানা কলা প্রদর্শনও এখানে হতে পারে।

৩। সমাপালক

পালাক্রমে বন্ধুদের বাড়ীতে গিয়ে সেখানে নানা প্রকার সুস্বাদু ফল নিয়ে তার সঙ্গে সুরা পান হয়ে থাকে। এতে আগে সম্মিলিত গণিকাদের সুরাপাত্র দেওয়া হয়, তাদের পান হয়ে গেলে নাগরিকবৃন্দ পান করবে। সেই সঙ্গে নানা রকম ফল খাওয়া হয়।

৪। উদ্যান প্রমোদ

ভিন্ন ভিন্ন বন্ধুর বাগানে প্রমোদ উৎসব হয়ে থাকে। যারা অংশ গ্রহণ করে তারা অশ্বে আরোহণ করে দাস-দাসী নিয়ে সেখানে যাবে। এখানে নানা খেলাধূলা, মোরগ লড়াই, নৃত্যগীত, যাদুবিদ্যা প্রভৃতি হয়ে থাকে। এইভাবে সারাদিন আনন্দে কাঠিয়ে সন্ধ্যাবেলা বাড়ী ফিরবে। ফেরার সময় বাগান থেকে পুষ্পস্তবক ও পুষ্পমালা প্রভৃতি নিয়ে ফিরবে।

৫। উপরে যেসব উৎসব বর্ণনা করা হল তা ছাড়া

সাধারণ নাগরিকদেরও কতকগুলি উৎসবে যোগদান করা অবশ্য কর্তব্য। তা এবারে একে একে বলা হচ্ছে।

ক) দেওয়ালি উৎসব।

খ) পূর্ণিমা উৎসব বা পূর্ণিমার রাতে নানান উৎসব।

গ) বসন্ত উৎসব - বসন্তকালে।

ঘ) অপক্ক আম্রোৎসব, শেখর লঞ্জলিকা - আম পাকার আগে।

ঙ) পিষ্টক উৎসব বা পিঠে বানানো।

চ) বিশ খাদিকা - ফাল্গুন-চৈত্র মাসে।

ছ) নব পত্রিকা - বর্ষার প্রথমে।

জ) হোলি উৎসব।

ঝ) পাঞ্চালি উৎসব বা ভাঁড়ামি।

ঞ) শিমুল উৎসব - শিমুল ফুল নিয়ে খেলা।

ট) কদম্ব উৎসব - কদম্ব ফুল নিয়ে খেলা।

ঠ) যব উৎসব - যবের গুঁড়া নিয়ে খেলা।

ড) ঝুলন উৎসব।

ঢ) মদন উৎসব - চৈত্র মাসে মদন দেবের সম্মান।

ণ) দমনকে উৎসব - ফুল নিয়ে খেলা।

ত) অশোক উৎসব - ফুল নিয়ে খেলা।

থ) পুষ্পচয়ণ উৎসব।

দ) আম্রলতিকা - কচি আমপাতা নিয়ে খেলা।

ধ) ইক্ষুমঞ্জিকা - আখ খাবার প্রতিযোগিতা।

সম্ভ্রান্ত নাগরিকের সঙ্গী ও কিংকর

পীঠ মর্দ

নাগরিকের সহযাত্রীদের মধ্যে পীঠ মর্দন সর্ব প্রধান। প্রেম বিজ্ঞানে সে বিশেষ পারদর্শী। তার স্ত্রী নেই, পুত্র কন্যা নেই। সংসারে কারও হেপাজত নেবার বাধ্যবাধকতা নেই। দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো ও প্রেম বিষয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ই তার জীবনের কাজ। অতি দরিদ্র সে কিন্তু খাওয়া পড়া কোনও সম্ভ্রান্ত নাগরিকের দায়িত্বে চলে। বাৎস্যায়নের কালে এরূপ পীঠ মর্দ প্রায়ই সম্ভ্রান্ত নাগরিকের থাকত। বর্তমান যুগে এরূপ লোক খুব অল্পই দেখা যায়।

বিট

এ আর এক প্রকারের লোক। বেশ লেখাপড়া জানা ও অভিজ্ঞ। এক কালে যথেষ্ট ধন সম্পত্তি ছিল কিন্তু কাম সম্ভোগে সমস্তই হারিয়েছে। মৃচ্ছকটিক নামক বহু পুরানো সংস্কৃতি নাটকে এরূপ একটি মানুষের অবতারণা দেখা যায়। এ সকল লোক ধনী ও প্রভুত্ব সম্পন্ন ব্যক্তির চিত্ত জয় করে থাকে। নিজে কিছু উপার্জন করে না, বড় লোক সঙ্গীর ব্যয়েই তার বাবুয়ানা চলে যায়।

বিদূষক

ইংরেজীতে যাবে বলে ‘বাফুন্থ’ বা ‘ক্লাউন’ তাদেরই সে আমলে বিদূষক বলা হত। এদের অন্য নাম ছিল ভাঁড়। ভাঁড়ামিই তার ব্যবসা। বড় বড় লোক ও রাজরাজড়াদের সঙ্গী। কোনও নারীর সঙ্গে প্রেম যুদ্ধে সেই হল ঐ ধনী রাজার বা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সাক্ষী বা দূত। বিদূষক সাধারণতঃ অবিবাহিত এবং ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত। সে তার সম্পত্তি নষ্ট করেছিল এবং সাধারণত এক দরিদ্র ব্যক্তি। রাজার বা সম্ভ্রান্ত নায়কের বড় বড় সভায় বিদূষক অনেক কৌতুকপূর্ণ কতাবার্তা বলে ও সভাষদবর্গকে বিভিন্ন কৌতুক দ্বারা উল্লাসিত করে থাকে।

সংস্কৃত নাটকে দেখা যায় যে বিদূষক নায়কের সহচর, এরা অভীষ্টা নারীর প্রতি দৌতকার্য্য করে থাকে। আধুনিক যুগে গোপাল ভাঁড়ের কথা সকলে জানেন। সম্রাট আকবরের সভায় রসিক বীরবল ঐ বিদূষকের একটি দৃষ্টান্ত। বিদূষকের মত কাজ অনেক স্ত্রীলোকেরাও করে থাকে। তারা কেউ কেউ-

১) উদাসিনী - সন্ন্যাসিনী যে বিজ্ঞানে বিশেষ পারদর্শিনী।

২) নারী নাপতানী।

৩) অসৎ দরিদ্রা নারী।

৪) নিঃসন্তান নারী।

৫) কোনও বৃদ্ধ বেশ্যা তপস্বিনী।

এরা সম্ভ্রান্ত বংশের কুল নারীদের নাগর সংগ্রহে প্রায় দূতীকার কাজ করে থকে।

দূতীর কাজ

দূতীরা খুব কুশলী হয়ে থাকে, এরা নায়ক বা নায়িকার গুণাবলী এমন সুন্দর ও বিশদভাবে বা বাড়িয়ে পরস্পরের কাছে বলে থাকে যে তারা মুগ্ধ হতে বাধ্য হয়। তাই দূতীকাদের সে আমলে বিশেষ কদর ছিল, কারণ সে আমলে লোকে জানত যে দূতীকারা নারীর পক্ষে অপরিহার্য। বিশেষ করে উচ্চ রাজ পরিবারে বা খুব উচ্চ রাজ পরিবারে বা খুব ধনী পরিবারের পক্ষে তারা ছিল অপরিহার্য। এই দূতীকারের গুণাবলীও ছিল অশেষ - তারা হাস্যরস, নাটক, গান ইত্যাদি জানত।